- January 25, 2025
- By Dr. Dipa Mitra
- 1595
- Blogs
New Year in perspective!
ইংরাজি নববর্ষের সুচনা-
নববর্ষ! নামটা শুনলেই মনের আকাশে পুঞ্জিভূত দুঃখ ও হতাশার মেঘ কেটে গিয়ে আশা, আনন্দ ও স্বপ্নপুরনের এক নতুন সূর্যোদয় হয়। সারা পৃথিবীর মানুষ তাদের নিজের মতো করে মেতে ওঠে বর্ষবরণ দিবসের আবাহনে। ধনী দরিদ্র ছোট বড় সবাই জাতি- ধর্ম- বর্ণ- নির্বিশেষে তাদের আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে উপভোগ করে মানব সভ্যতার এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে। নিঃসন্দেহে বর্ষবরণ উৎসব পৃথিবীব্যাপী পালিত সমগ্র উৎসবের মধ্যে প্রাচীনতম। আজ থেকে প্রায় ৪০০০ বছর আগে , খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাক) সর্বপ্রথম শুরু হয় নববর্ষের উৎসব।
সে যুগে এই মেসোপটেমিয়া সভ্যতা আবার ৪ টি ভাগে বিভক্ত ছিল- সুমেরীয় সভ্যতা, ব্যাবিলনিয় সভ্যতা, আসিরিয় সভ্যতা ও ক্যালডিও সভ্যতা। কিন্তু একসাথে সর্বত্র নয়, এদের মধ্যে মহাসমারোহে নববর্ষের উৎসব প্রথম শুরু হয় ব্যাবিলনিয় সভ্যতায়। তবে ১লা জানুয়ারিতে নয়, সেইসময় বছর শুরু হত বসন্তকালে। যখন শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে ফেলে নবপল্লবে সজ্জিত বৃক্ষরাজি জেগে উঠত পুষ্পশোভায়, পাখিদের কুহুকুজনে আকাশ বাতাস মুখরিত হত, প্রকৃতি তার অপরূপ মহিমায় জেগে উঠত নব আনন্দে, সেই স্বর্গীয় বাতাবরণে, বসন্তের প্রথম চাঁদের আলোয় শুরু হতো সে যুগের বর্ষবরণ উৎসব, চলতো টানা ১১ দিন। তখনকার দিনে বর্ষগণনা হতো চন্দ্রকলা অনুসারে।
ব্যাবিলনিয় সভ্যতার পর জাঁকজমক করে নববর্ষ পালন শুরু করে রোমানরাও, অধিকন্তু তারা আবার সময়ের হিসেব রাখার জন্য জন্ম দেয় চন্দ্রকলানির্ভর বর্ষপঞ্জী অর্থাৎ ক্যালেন্ডারের। সেই বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী রোমানদের নববর্ষ ছিল ১লা মার্চ। অবশ্য প্রথমদিকে তাতে মাস ছিল মাত্র ১০টা। জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারির কোনও অস্তিত্বই সে যুগে ছিল না। পরে সম্রাট নুমা পন্টিলাস এতে জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাস যোগ করেন। তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে সেইসময় রোমান বর্ষপঞ্জীতে কিন্তু কোনও তারিখ ছিলো না। চন্দ্রকলা অনুসারে মাসের বিভিন্ন সময়কে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হতো- চন্দ্রোদয়ের সময়কে বলা হতো ক্যালেন্ডস, পূর্ণচন্দ্রকে বলতো ইডেস, অর্ধচন্দ্রকে বলতো নুনেস। পরে সম্রাট জুলিয়াস সিজার এই ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন ঘটান। তিনি ক্যালেন্ডস, ইডেস, নুনেসের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি পেতে প্রবর্তন করেন তারিখের।তবে চন্দ্রবর্ষে সাধারনত ২৯ দিনে মাস হওয়ায় এতে দিনসংখ্যা এখনকার সৌরবর্ষের তুলনায় কম ছিল।
যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগে, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে ঠিক করা হয়েছিলো বর্ষবরণের সূচনা হবে ২৬ মার্চ। কিন্তু রোমানরা সেই আগের মতো মার্চের ১ তারিখেই বর্ষবরণ উৎসব পালন করতে থাকে। পরে জুলিয়াস সিজার যখন ৩৬৫ দিনে বছরের প্রবর্তন করেন, তখন ঘোষণা করেন- মার্চে নয়, বছর শুরু হবে জানুয়ারির ১ তারিখে, বর্ষবরণ উৎসবও সেইদিনই হবে। তারপর থেকে নববর্ষের উৎসব মার্চ মাস থেকে চলে আসে জানুয়ারিতে।
তবে সিজারের বর্ষপঞ্জীতে সামান্য কিছু সমস্যা ছিলো। সেই সমস্যা দূর করেন একজন ডাক্তার, অ্যালোসিয়াস লিলিয়াস। কিন্তু ইতিহাসে তার নাম থেকে যায় সবার অগোচরে। কারণ, সেই বর্ষপঞ্জীর কথা সবাইকে জানান একজন পোপ, ত্রয়োদশ (১৩তম) গ্রেগরি। আমরা সবাই তাঁর কথাই জানি। এই পোপ গ্রেগরির নামানুসারেই পরবর্তীকালে ক্যালেন্ডারটির নামকরণ হয় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার।
এইভাবেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ১লা জানুয়ারির বর্ষবরণ উৎসব। তবে পৃথিবীর প্রায় সব দেশই ইংরেজি নববর্ষের পাশাপাশি নিজস্ব বর্ষবরণের উৎসবও পালন করে । ভারতবর্ষেও এর অন্যথা হয় না, তাই বিভিন্ন রাজ্যে পয়লা জানুয়ারির বর্ষবরণের সাথে সাথে অনুষ্ঠিত হয় তাদের আঞ্চলিক বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। ঠিক সেইভাবেই পশ্চিমবঙ্গেও প্রায় ৮ কোটি বাঙ্গালী প্রতিবছর ইংরাজি নববর্ষে রাত জেগে আনন্দোৎসব করলেও , নিষ্ঠাভরে বাংলা বর্ষবরণ পালন করে পয়লা বৈশাখের পুণ্য প্রভাতে।
অন্য দেশে বর্ষবরণ ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কার –
নববর্ষের উৎসবমুখরতার সাথে সাথেই নানান সংস্কার প্রচলিত আছে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।
চীনে নববর্ষ বা বসন্ত উৎসব পালিত হয় বিপুল সমারোহে। এদেশে যেহেতু চন্দ্রবর্ষপঞ্জী মানা হয়, তাই এখানে জানুয়ারির প্রথম দিনকে নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। চৈনিক নববর্ষের কোনও সুনির্দিষ্ট দিন থাকে না, তবে সাধারণত বছর শুরু হয় ২১শে জানুয়ারি থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে। এই বছর যেমন নববর্ষ অনুষ্ঠিত হল ১৬ই ফেব্রুয়ারি। বিচিত্র এই প্রাচীন ভূখণ্ডে প্রতিটি বছর বিশেষ কোনও এক মনুষ্যেতর প্রাণীর নামে চিহ্নিত করা হয়। সর্বমোট ১২ টি পশুর নামে ধার্য থাকে একেকটি বছর। প্রতি ১২ বছর পর আবার এই চক্র ঘুরে ফিরে আসে। যেমন ২০০৬ এর পর আবার এই বছরটি অর্থাৎ ২০১৮ নির্দিষ্ট হয়েছে সারমেয়বর্ষ রূপে। এখানে বর্ষ শুরুর এক সপ্তাহ আগে থেকে চলে সাফাই অভিযান, জীর্ণ পুরাতনকে বর্জন করে তারা বিদায় জানায় পুরনো বছরকে। এরপর বসন্ত উৎসবের রক্তিম বর্ণে তারা রাঙিয়ে তোলে তাদের ঘর বাড়ি, রাস্তাঘাট, মেতে ওঠে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আতশবাজি সহ আলোর রোশনাই এ সেজে ওঠে গোটা দেশ। পূর্বপুরুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানিয়ে যোগ দেয় পারিবারিক নৈশ ভোজে। এই উৎসবে মাছ কিন্তু অবশ্য ভক্ষণীয়। ইউরোপ আমেরিকার মতো চীনেও নতুন বছর আসার আগেরদিন মধ্যরাত অবধি জেগে চলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর বিপুল হৈচৈ ও জনসমাগম। জনগণ রাস্তায় নেমে আনন্দ প্রকাশ করে, তাদের বিখ্যাত ড্রাগন ও সিংহের প্রতীক নিয়ে নাচ-গান করে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য চীনা প্রবাদ অনুযায়ী ড্রাগন দীর্ঘায়ু ও সম্পদের আর সিংহ বীরত্বের প্রতীক।
জাপানিরা জানুয়ারির প্রথম দিনকেই নববর্ষ হিসেবে উদযাপন করে। জাপানিদের কাছে এটি বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব। নববর্ষকে জাপানিরা বলে ‘শোগাটসু’। আর বছরের প্রথম দিনটিকে বলে ‘গান্তান’। এই দিন সকাল থেকে উপচে পরে জাপানি উপাসনা গৃহ। তারা মন্দির বা ‘শ্রিনে’ গিয়ে তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের জন্য প্রার্থনা করে। বছরের এই প্রথম মন্দির দর্শনকে জাপানিরা বলে ‘হাতসুমউদে’। এরপর পরিবারের সব সদস্য একত্রিত হয়ে তাদের বিশেষ পদ ‘ওসেচি রাইওরি’ সেবন করে। প্রতিটি খাদ্যগ্রহণের মধ্যেই নিহিত থাকে তাদের প্রাচীন সংস্কার। তারা চিংড়ি মাছ খায় দীর্ঘ জীবনের উদ্দেশ্যে, হেরিং রো তাদের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, অন্যান্য খাবারেও জড়িয়ে থাকে এমনই নানা অনুষঙ্গ। তবে তাদের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী পদ হল ‘মোচি’, এক বিশেষ ধরনের চালের পিঠে এবং ‘জৌনি’ নামক এক অতি উপাদেয় পানীয়। এদেশে এই দিনে ছোটদের ‘ওতোশিদামা’ অর্থাৎ নববর্ষের জন্য বিশেষ অর্থ উপহার দেওয়ার রেওয়াজ সুপ্রাচীন। বছর শুরুর পর প্রথম সাক্ষাতে জাপানিরা পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানায় ‘শুভ নববর্ষ’ অর্থাৎ ‘অ্যাকেমাসিতে ওমেদেতৌ গজাইমাসু’ সম্ভাষণে। এইসময় আগে প্রায় সপ্তাহখানেক সমস্ত ব্যবসার কাজ বন্ধ রেখে সারা দেশ মেতে উঠত ছুটির মেজাজে। ইদানীংকালে অবশ্য উৎসবমুখর জাপানি ও বিদেশী পর্যটকদের সুবিধার্থে এই ছুটির আবহেও বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও সুপারমার্কেট খোলা থাকে।
কোরিয়ার জনগণ সাধারণত পালন করে তাদের চন্দ্রবর্ষ, এই নববর্ষকে তারা বলে ‘সিওল্লাল’, আবার কোনোকোনো স্থানে সৌর বর্ষানুযায়ী ‘সিওন জেওং’ ও পালিত হয়। ‘সিওল্লাল’ এর উৎসব চলে ৩দিন ব্যপী। এ বছর ১৬ই ফেব্রুয়ারি ছিল কোরিয়ানদের সেই খুশির দিন।নববর্ষের সকাল শুরু হয় এদিনের বিশেষ পোশাক ‘সিওল বিম’ বা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘হানবাক’ পরিধান করে পূর্বপুরুষের তর্পণের মধ্য দিয়ে তাদের সম্মান জানিয়ে।এরপর ছোটরা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম অর্থাৎ ‘সেবেই’ করে তাদের আশীর্বাদ নেয়, সবাই মিলে ‘টুক্কুক’ সুপ খায়। তারা বিশ্বাস করে, এই বিশেষ পানীয় সেবন করলে তাদের আয়ু এক বছর করে বৃদ্ধি পায়।
১৯০৪ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টাইম স্কোয়ারে, আজকের মতো ‘বল রোলিং’ দিয়ে নয়, আতশবাজির উৎসবের মধ্য দিয়ে বর্ষবরণের উৎসব শুরু হয়। কিন্তু বছর দুয়েক যেতে না যেতেই নিষিদ্ধ হল এই আগুন নিয়ে উৎসবের মাতামাতি। কিন্তু তা থামাতে পারলো না উৎসবপ্রেমী মানুষের আবেগ। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়, যার নতুনত্ব আজও সারা পৃথিবীতে সমাদৃত। জনসাধারণের উৎসাহে উৎসবের উদ্যোক্তারা এরপর প্রতি বছর ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যরাত্রে ঠিক ১১টা ৫৯ মিনিটে এক ৭০০ পাউন্ডের লোহা ও কাঠের তৈরি বল গড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে টাইম স্কোয়ারের এক সুউচ্চ মিনার থেকে। ঠিক এক মিনিট ধরে সেই ‘বল রোলিং’ চলতে থাকে আর উৎফুল্ল জনতা তুমুল হর্ষধ্বনিতে ‘কাউন্ট ডাউন’ করতে করতে স্বাগত জানায় নববর্ষকে।
তবে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিতে বিশেষ করে মেক্সিকো ও ব্রাজিলে বিশ্বাস করা হয় সারাবছর কেমন যাবে তা নির্ভর করবে এই বিশেষ দিনটিতে পরিধেয় অন্তর্বাসের রঙের ওপর। অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর হলেও এই সব দেশের মানুষদের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী হলুদ রঙ- উন্নতি, সম্পদ ও সাফল্যের, লাল- প্রেম ও ভালোবাসার, নীল -স্বাস্থ্য সুখ ও মানসিক প্রশান্তির, সবুজ- সজীবতা, ভালো থাকা ও প্রকৃতির, সাদা- সুখ, শান্তি ও সম্প্রীতির প্রতীক। আগামী বছর যে যেভাবে কাটাতে চায় সেই অনুযায়ী সে রঙ নির্বাচন করে তার আগের দিন।
স্পেন বা স্প্যানিশভাষী দেশগুলিতে নববর্ষের মধ্যরাত্রে ১২ মাসের সৌভাগ্যের ইঙ্গিতবাহী ১২ টি আঙুর খাওয়া হয়। শুধু একটি কামড় এবং সেটি গলাধঃকরণ করা, বর্ষব্যপী সৌভাগ্য এসে যাবে হাতের মুঠোয় ! কি অদ্ভুত এই সংস্কার!
জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় আবার নতুন বছর কেমন কাটবে জানার জন্য চামচে পারদ নিয়ে তা গরম করে তাকে ঠাণ্ডা জলে ফেলে দেখা হয় সেটি ঠিক কি আকার ধারণ করলো। এই আকার বিশ্লেষণ করে এদেশের মানুষ অনুমান করে আগামী বছর তাদের কেমন যাবে! যদি তা বলের আকার নেয়, তবে তা হবে সৌভাগ্যের প্রতীক; যদি তা নোঙ্গরের রূপ নেয়, তবে নতুন বছরে হতে হবে অন্যের সাহায্য তথা অনুগ্রহপ্রার্থী; আবার যদি তা ক্রসের আকার নেয় তবে তা মৃত্যুর বার্তাবহ। তবে ভবিষ্যৎ যাই বলুক না কেন, জার্মানিতে মধ্যরাতে একপেয়ালা ‘সেক্ট’ এ চুমুক দিয়ে পরস্পরকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা ‘প্রসিত নেউজার’ জানিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ।
ফ্রান্সে বর্ষবরণের উৎসব শুরু হয় ২৫ শে ডিসেম্বর ,অর্থাৎ যিশুখ্রিষ্টর জন্ম মুহূর্ত থেকে, চলে ৬ই জানুয়ারি অর্থাৎ বাইবেলে বর্ণিত সেই তিন দেবপুরুষের আগমনের দিন পর্যন্ত। ‘নিউ ইয়ার ইভ’ এর বিশেষ পোশাকে সজ্জিত হয়ে মধ্যরাত্রে নাচে গানে শ্যাম্পেনের ফোয়ারায় চুম্বনের মদিরতায় মেতে ওঠে গোটা দেশ। সেই বিশেষ মুহূর্তকে স্মরণীয় করতে ঢল নামে সুপ্রাচীন প্রাসাদনগরী তথা ভালোবাসার প্রাণকেন্দ্র প্যারিসের সেই বিখ্যাত রাজপথ সাঁজে-লিঁজেতে ( দ্য চ্যাঁম্প এলিসিস)। তবে পাশ্চাত্যের অন্য দেশের মতো এদেশে কিন্তু প্রকৃত বর্ষ শুরুর আগে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর রেওয়াজ নেই। একমাত্র ৩১শে ডিসেম্বর মধ্য রাত্রির পর তারা পরস্পরকে ‘বন অ্যানি এট বন সাঁটে’ বলে শুভেচ্ছা জানায়। খাদ্য পানীয়ের বিপুল সম্ভারে জমে ওঠে বর্ষবরণ উৎসব। কিং কেক, পেস্ট্রি, ওয়েফার সহযোগে তারা মেতে ওঠে খুশির ফোয়ারায়। তবে ফরাসীরা নতুন বছর উপলক্ষে শুধু বাড়ির ছোটদেরই উপহার দেয় না, বহু শ্রমজীবী মানুষকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী অর্থদান করে।
ফ্রান্সের পর আশা যাক তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের কথায়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ইংল্যাণ্ডে বর্ষবরণ উৎসব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিনে পালিত হয়েছে। ১৭৫২ সাল থেকে নববর্ষের এই উৎসব এদেশে ২৫ শে ডিসেম্বরের বদলে ১লা জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে শুরু করে। ইংল্যাণ্ডের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের পুরনো ঐতিহ্য মেনে নববর্ষে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বর্ষ শুরুর গান গাইতে গাইতে প্রতিবেশিদের বাড়িতে যায়, প্রতিবেশিরা তাদের হাতে আপেল দিয়ে, মিষ্টি মুখ করিয়ে পকেটে ভরে দেয় পাউণ্ডের চকচকে মুদ্রা। এই দেশের সংস্কার অনুযায়ী যারা সেদিন বেলা ১২ টার আগে এই গান না গায়, তাকে ‘বোকা’ বলে চিহ্নিত করা হয়। ইংল্যাণ্ডবাসীদের কাছে বছরের প্রথম দিনে ‘ফার্স্ট ফুটিং’ খুবই অর্থবহ। তারা মনে করে এই দিনে কারো বাড়িতে প্রথম পা রাখা মানুষটি, অর্থাৎ ‘ফার্স্ট ফুটার’, তাদের সারাবছরের আনন্দ বা দুঃখের নির্ণায়ক। সেই মানুষটির যদি লাল চুল হয় বা সে যদি কোনও অসুন্দর মহিলা হয়, তবে নিশ্চিতরূপে বছরটি হবে দুর্ভাগ্যের। অন্যদিকে কালো চুলের অধিকারী, রুটি, টাকা অথবা হাতে নুন এমনকি কয়লা নিয়ে আসা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে প্রথম দেখা হলে বুঝতে হবে বছরটি হবে আনন্দময়। লণ্ডনবাসীরা ৩১শে ডিসেম্বর মধ্যরাত্রে ট্রাফালগার স্কোয়ারে অথবা পিকাডেলি সার্কাসে জড়ো হয়ে বিগবেনের ঘণ্টাধ্বনি শুনে, স্বাগত জানায় নববর্ষকে, প্রার্থনা করে তাদের পরিবারের তথা দেশের সুখ সমৃদ্ধির।
আবার পয়লা বৈশাখে ইংল্যান্ডে অবস্থানকারী প্রবাসী বাঙালীরা তাদের বাংলা টাউনে আয়োজন করে বৈশাখী মেলার। পূর্ব লন্ডনের হ্যামলেট টাওয়ার হয়ে ব্রিক লেন ধরে এই মেলা ছড়িয়ে পড়ে বেথন্যাল গ্রিনের ওয়েভার ফিল্ড ও অ্যালেন গার্ডেন পর্যন্ত। সারা ইংল্যান্ডের প্রায় আশি হাজার মানুষ যোগ দেয় এই মেলায়।বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত ১৯৯৭ সাল থেকে চলে আসা এই মেলা এপ্রিলের বৃষ্টির প্রকোপ এড়াতে অনুষ্ঠিত হয় মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে।
বর্তমানে এইভাবে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক ও জাপানের টোকিও শহরেও বাংলা নববর্ষে অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখী মেলা। সঙ্গীত নৃত্যের মূর্ছনায় জমে ওঠে বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
দুই বাংলার বাইরে পরবাসে এমন বাঙালি উৎসবে নিঃসন্দেহে শিকড়ের টান খুঁজে পান প্রবাসী বঙ্গসন্তান, আর একইভাবে সমৃদ্ধ হয় তাদের থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থানকারী দুই বাংলার মানুষ।
বাংলা নববর্ষ- গৌরচন্দ্রিকা
বড় জানতে ইচ্ছে করে, পরভূমে শিকড়ের টান খোঁজা বাঙ্গালী কিভাবে নিজভূমে উদযাপন করে তাদের বর্ষবরণ উৎসব ?
প্রহর শেষের আলোয় রাঙ্গা চৈত্র মাসের শেষ বেলায় জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে দুই বাংলার বাঙ্গালীমন বরণ করে নেয় ‘দারুণ অগ্নিবাণে’ হৃদয় তৃষ্ণার্ত করা গ্রীষ্মের উষ্ণতা নিয়ে আসা বাংলার বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাস বৈশাখকে। শুরু হয় এক নতুন বঙ্গাব্দ। উৎসবমুখর বাঙ্গালী গানে, গল্পে, কবিতায়, আড্ডায়, মিষ্টি মুখে তথা ভুঁড়ি ভোজনে তার পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে অন্তত এই একটি দিনে ষোলোআনা উপভোগ করে তার বাঙ্গালিয়ানা।
নতুন বছরের উৎসবের সাথে সেই সুচনাকাল থেকেই দুই বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এক নিবিড় সংযোগ। এই বিশেষ দিনটিতে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় অর্থাৎ বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘ধুতি-পাঞ্জাবি এবং শাড়ি’ পরিধান করে তারা সময় কাটায় তাদের পরিবারের সাথে, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে যায়। দুই বাংলার শহর গ্রামেই উৎসবের আমেজ অবশ্য ছড়িয়ে পরে চৈত্রমাস থেকেই। শহুরে মানুষের কাছে যে উৎসবের সুচনা শুরু চৈত্র-সেল দিয়ে , গ্রাম-গঞ্জে তা মুখরিত হয় গাজনের মেলায়। শহরতলিতে অবশ্য দুইয়েরই মিশেল পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলেও চলে দিনভর ভিন্ন স্বাদের সাংস্কৃতিক আড্ডা ও সঙ্গীত নৃত্য পরিবেশন; যার রম্যরসের মাদকতায় ও ঘরে বাইরের বিবিধ আয়োজনে, তদোপরি নিত্য নতুন পদের সমাবেশে রসনাতৃপ্তিতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে বাঙ্গালী হৃদয়।
এবার আসা যাক ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী ও এপার বাংলার প্রাণকেন্দ্র কল্লোলিনী কলকাতার পয়লা বৈশাখ উদযাপনের বর্ণনায়। নববর্ষ উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন পাড়ার নানাবিধ সংগঠনের উদ্যোগে প্রভাতফেরি আয়োজিত হয়। পাড়ায় পাড়ায় চলে মিষ্টিমুখ, প্রণাম ও কুশল বিনিময়। সন্ধ্যেবেলায় ছোট বড় সবাই মিলে জমায়েত হয়ে অনুষ্ঠিত হয় এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। পয়লা বৈশাখের দিন উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে কলকাতার বিখ্যাত কালীঘাট মন্দিরে। সেখানে বহু ব্যবসায়ী ভোর থেকে প্রতীক্ষা করে থাকেন দেবীকে পূজা নিবেদন করে হালখাতা আরম্ভ করার জন্য। দোকানে দোকানে সম্পদরূপিনী দেবী লক্ষ্মী ও বিঘ্ননাশকারী সিদ্ধিদাতা গনেশের পুজো করা হয় ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধির জন্য। হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে ঐতিহ্যবাহী দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট তথা বাংলার বিভিন্ন মন্দিরে, পরিবারের মঙ্গল কামনা ক’রে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে।
ওপার বাংলার বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। রাজধানী ঢাকা শহরে পয়লা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু- রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠান, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পীরা তাদের সম্মিলত সঙ্গীতে নতুন বছরকে আহবান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ । ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। ২০০১ সালে বোমা হামলায় অসম্পূর্ণ থেকে গেছিল এ অনুষ্ঠান। কিন্তু কোনও সাম্রাজ্যবাদী দল কোনোকালে কোনও দেশেই তার পেশীশক্তির আস্ফালনে রুদ্ধ করতে পারেনি মানুষের আবেগকে। তাই মানুষের ইচ্ছেশক্তির জোরে আজও অমলিন আছে এই বর্ষবরণ উৎসব। ভাগ হয়েছে বাংলা, ভাগ হয়নি এককালের ‘দুধে ভাতে’ বাঙালীর আবেগ, ফুরিয়ে যায়নি তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখার ‘দুরন্ত আশা’। তবে যে চৈত্র-সংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বাঙ্গালীর এই বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন, বড় জানতে ইচ্ছে করে তার আদি বৃত্তান্ত।
বাংলা মাসের আদি বৃত্তান্ত
সেই প্রাচীন বৈদিক যুগের শেষপর্যায় থেকেই ৬ টি বেদাঙ্গ যথা শিক্ষা, ছন্দ, ব্যকরন, নিরুক্ত, কল্প ও জ্যোতিষ- এর অনুশীলনে মানুষ ছিল সর্বক্ষেত্রে পারঙ্গম। ষষ্ঠ বেদাঙ্গ ‘জ্যোতিষ’ অধ্যয়নের ফলে সময় গণনা ও দিন নিরূপণের পদ্ধতি ছিল তাদের আয়ত্ত্বে।
মাৎস্যপুরাণে বর্ণিত আছে ব্রহ্মাপুত্র প্রজাপতি দক্ষের অনন্যসুন্দর বাষট্টিজন কন্যার মধ্যে যে সাতাশজনের বিবাহ হয়েছিল চন্দ্রদেবের সাথে, তাদের নামানুসারে সাতাশটি নক্ষত্রের নামকরণ হয়েছিল।এইভাবেই এককন্যা চিত্রার নামানুসারে চিত্রানক্ষত্র এবং তা থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ করা হয়; আরেক কন্যা বিশাখার নামানুসারে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র এবং তা থেকে বৈশাখ মাসের নামকরণ করা হয়।
পুরাণ মত ছাড়াও বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, বাংলা মাসের নামকরণ হয়েছে বিভিন্ন নক্ষত্রের নাম থেকে, আর তা গৃহীত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ থেকে।
• বৈশাখ – বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • জ্যৈষ্ঠ – জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • আষাঢ় – উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • শ্রাবণ – শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • ভাদ্র – পূর্বভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • আশ্বিন – অশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • কার্তিক – কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • অগ্রহায়ণ – মৃগশিরা (অগ্রহায়ণী) নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • পৌষ – পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • মাঘ – মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • ফাল্গুন – উত্তরফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে। • চৈত্র – চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মাস হিসাবে বৈশাখের প্রথম হবার মর্যাদা কিন্তু সেই পুরাকালের নয়। বৈদিক যুগে সৌরমতে বৎসর গণনার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল সেখানে যদিও বৈশাখের সন্ধান মেলে, কিন্তু সে যুগের তথ্যানুযায়ী তখন তার স্থান সবার প্রথমে ছিল না। তখন বাংলা সন অর্থাৎ বঙ্গাব্দেরও প্রচলন হয়নি। ছিল শুধুই ভারতীয় সৌরসন গণনা পদ্ধতি। ঐতিহাসিকদের মতে বৈদিক যুগে বাংলা বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটা শুরু হত বলে এই মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হত। অগ্র অর্থ প্রথম আর হায়ন অর্থ বর্ষ বা ধান। নামের সাথে সাযুজ্য রেখেই এটি ছিল বছরের প্রথম মাস। এখনও তাই পুরাতন রীতি অনুযায়ী অগ্রহায়ণ মাসে নবান্ন উৎসব পালিত হয় বাংলার ঘরে ঘরে।
বঙ্গাব্দের সূচনা- মতভেদ
রাজা বিক্রমাদিত্যের শাসনকালে ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রবর্তিত হয় বাংলা বর্ষপঞ্জী, খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ অব্দ থেকে শুরু হয় এই ‘বিক্রমী’ সময়পঞ্জীর গণনা।
কোনও কোনও গ্রন্থকারের মতে প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। ইতিহাস অনুযায়ী সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে শশাঙ্ক বঙ্গদেশের রাজা ছিলেন। আধুনিক বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার অধিকাংশ এলাকা তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ মতভেদ থাকলেও অনুমান করা হয় যে, তাঁর রাজত্বকালের প্রথমদিকেই সূচনা হয়েছিল বঙ্গাব্দের ।
পুঁথি গবেষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য কিন্তু এ প্রসঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বাংলা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সন-তারিখ সম্পর্কে নানা অনুসন্ধান করেছিলেন। সে জন্য তাঁকে এ অঞ্চলের সন-তারিখ বিশেষজ্ঞ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি তাঁর বিশিষ্ট গবেষণাকর্ম ‘বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয়’ (প্রথম খণ্ড পৃ. ৩৭৮)-এ বলেছেন : ‘‘সুলতান হোসেন শাহের সময়ে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন চালু হয়। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালিত্বের বিকাশেও শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ও সুলতান হোসেন শাহের অবদান বিরাট। সুলতান হোসেন শাহ নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে গর্ব অনুভব করতেন। ‘শাহ-এ-বাঙালিয়ান’ বলে নিজের পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি। তাদের একজন, অর্থাৎ হোসেন শাহের পক্ষে বাংলা সন চালু করা অসম্ভব নয়।’’
তবে সুলতানি আমল নিয়ে গবেষণা বিশেষজ্ঞ শ্রী সুখময় মুখোপাধ্যায় অবশ্য এ মত মেনে নিতে পারেননি। তিনি লিখেছেন : ‘‘কোন বিষয় থেকে যতীন্দ্রবাবু এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা তিনি উল্লেখ করেননি। সেজন্য একে গ্রহণ করতে আমাদের অসুবিধা আছে।” হোসেন শাহ বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন এ মতের বিপক্ষে একটি যুক্তিও তিনি দেখান। “হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহ একটি সংবৎ প্রবর্তন করেছিলেন যা ‘নসরৎশাহী সন’ নামে পরিচিত।” (সুখময় মুখোপাধ্যায়, ১৪০০ সাল, শারদীয় সংখ্যা এক্ষণ, কোলকাতা)। পিতাপুত্রের প্রবর্তিত সনের এর তফাত মাত্র দু’বছরের! বঙ্গাব্দ যদি হোসেন শাহের দ্বারা প্রবর্তিত হত, তাহলে তার পুত্র দু বছরের মধ্যেই আবার একটি নতুন সন প্রবর্তন করতেন কি?
এ প্রসঙ্গে যাবতীয় গবেষনা বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করলে প্রশ্নচিহ্ন কিন্তু একটাই থেকেই যায়। তবে কিভাবে শুরু হল আজকের এই বঙ্গাব্দ? কৌতূহল নিরসনে শুরু হয় আরও গবেষণা!
ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা এখানকার কৃষি ফলনের সময়ের সাথে মিলত না। যার ফলে অসময়ে বলপূর্বক কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। মূলত, খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে বাংলা সনের পুনঃপ্রবর্তন হয়। সেই পুরাকাল থেকে বাংলার বছরের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। শোনা যায়, বৈশাখ মাস থেকে বাংলায় প্রথম খাজনা আদায় প্রবর্তন করেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ।
বঙ্গাব্দের সূচনা নিয়ে বিবিধ গবেষণার মিলিত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সর্বাপেক্ষা প্রচলিত মত কিন্তু সম্রাট আকবরের পক্ষে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ৯৯২ হিজরী অর্থাৎ ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলার ফসল কাটার মৌসুম অনুসারে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রাচীন বর্ষপঞ্জীতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। কারণ তৎকালীন মূল হিজরী পঞ্জিকার চন্দ্রবর্ষের দিনসংখ্যা ছিল সৌরবর্ষের চেয়ে কম। যেখানে সৌর বৎসর ৩৬৫ দিনের, সেখানে চন্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিনের। একারণে সাধারণত চন্দ্র বৎসরে বাংলার ঋতুগুলির সময়কাল ঠিকমত থাকত না। কিন্তু যেহেতু এখানকার কৃষিকাজ ও কৃষিফলন সবটাই ঋতুনির্ভর, তাই সম্রাট নতুন একটি সনের প্রবর্তনের জন্যে অনুরোধ করেন বিজ্ঞ রাজজ্যোতিষী ও পন্ডিত আমির ফতেহউল্লাহ্ সিরাজীকে। সিরাজী পারস্যে প্রচলিত সৌর বর্ষপঞ্জীর অনুকরণে চন্দ্রমাসের সঙ্গে সম্রাটের সিংহাসনের আরোহনের বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ সাল থেকে এবং ভারতীয় সৌরসনের সমন্বয়ে বাংলাসনের প্রবর্তন করেন। নাম হয় ‘তারিখ-ই-ইলাহি’। মাসের নামগুলো সৌরমতে রেখেই পূর্ণবিন্যাস করেন তিনি। সেই নববিন্যাস অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশাখ মাস চলে আসে সবার প্রথমে। মতান্তরে ১৫৫৬ সালে মহরমের মাস ছিল বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখে নববর্ষের উৎসব পালিত হয়।
তবে রাজা শশাঙ্কের আমলের দুই শিব মন্দিরে বঙ্গাব্দের নিদর্শন পেয়ে সন্দেহ জাগে। আকবরের রাজত্বকালের চেয়েও সেগুলি বহু শতাব্দী প্রাচীন। তবে বঙ্গাব্দের সূচনা আকবর করবেন কি করে? প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে আকবর প্রবর্তিত ‘তারিখ ই ইলাহি’ নাকি তাঁর মৃত্যুর সাথেই জনপ্রিয়তা হারায়, শুধু তার রেশ থেকে যায় এই বাংলা বর্ষপঞ্জীতে। অনুমান করা যেতে পারে আজকের বঙ্গাব্দের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সেই প্রাচীন জ্যোতিষ শাস্ত্র, বিক্রমাদিত্য, রাজা শশাঙ্ক, হোসেন শাহ, মুর্শিদকুলি খাঁ তথা সম্রাট আকবরের মিলিত অবদান। তবে মতভেদ থাকলেও ইংরাজি ও বাংলা সালের তফাৎ পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, জুলীয় বর্ষপঞ্জীর বৃহস্পতিবার ১৮ মার্চ ৫৯৪ এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর শনিবার ২০ মার্চ ৫৯৪ তে বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল, ইতিহাস অনুযায়ী তখন বাংলায় রাজা শশাঙ্কের রাজত্বকাল।
বাংলা দিনের নামকরণ
কথিত আছে, সম্রাট আকবর বঙ্গাব্দ সূচনা করলেও সেই সময় মাসের প্রত্যেকটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা নাম ছিল। যা কিনা প্রজাসাধারণের পক্ষে মনে রাখা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল। পরবর্তীকালে আকবরের প্রিয় পৌত্র খুরম অর্থাৎ সম্রাট শাহজাহান ৭ দিনে সপ্তাহভিত্তিক বাংলায় দিনের নামকরণের কাজ শুরু করেন।
তবে ভিন্নমতে, সূর্যসিদ্ধান্তে’র নবগ্রহের আদলে বাংলায় সপ্তাহের ৭টি দিনের নামকরণ করা হয়। যেমন: • রবিবার – সূর্যদেবের (সান) নামানুসারে। • সোমবার – চন্দ্রদেবের (মুন) নামানুসারে। • মঙ্গলবার – ভূমিপুত্র মঙ্গলের (মার্স) নামানুসারে। • বুধবার – চন্দ্রদেবের পুত্র বুধের (মারকারি) নামানুসারে। • বৃহস্পতিবার – দেবগুরু বৃহস্পতির (জুপিটার) নামানুসারে। • শুক্রবার – ভৃগুপুত্র শুক্রের (ভেনাস) নামানুসারে। • শনিবার – শনিদেবতার (স্যাটার্ন) নামানুসারে।
বঙ্গ জীবন ও সাহিত্যে নববর্ষ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে মানুষকে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন পটভূমিতে প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়েছে। আর এই সংগ্রামের বিভিন্নকালের ইতিহাসই মানবসভ্যতার সত্যিকারের দিনপঞ্জি। তবু কোনও এক বিশেষকালে বিশেষ প্রয়োজনেই মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করতে গিয়ে প্রণয়ন করেছিল দিনপঞ্জি, সন-তারিখ। এইভাবেই বাংলায় প্রবর্তন হয়েছিল বঙ্গাব্দ, যার বর্ণচ্ছটায় আলোকিত হয়েছিল আমাদের জীবন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি।
আমাদের অধুনা নববর্ষ এ দেশের গ্রীষ্মকালীন উৎসব, এর ঐতিহ্য প্রাচীন, কিন্তু রূপ চিরনুতন। আর এই বর্ষবরণ উৎসবের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে চৈত্র-বৈশাখের অমোঘ-সহচর, নবসৃষ্টির অগ্রদূত, নববর্ষের বার্তাবহ কালবৈশাখী; যা আমাদের সমস্ত মোহ কালিমা, মত্ত বাসনা ঝড়ে জলে ভাসিয়ে দিয়ে চিরনূতনের বিজয় কেতন নিয়ে আসে; যার প্রলয়নাচনের ছন্দে ঝংকৃত হয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষুরধার লেখনী- ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর, তোরা সব জয়ধ্বনি কর— ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়! তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’ আবার কালবৈশাখীর ঝড়ের মাতন দেখে আমাদের রবি কবি এই পুণ্যলগ্নে যেন জীবনের সমস্ত অচলায়তন ভেঙ্গে জীর্ণ পুরাতন ধ্যান ধারণা ছেড়ে নববিপ্লবের বার্তাবহ চঞ্চল অদ্ভুত ‘নূতন যৌবনের দূতদের আহ্বাণ করেন- “ওরে ঝড় নেমে আয়, আয় রে আমার শুকনো পাতার ডালে।”
পয়লা বৈশাখ সব বাঙালিরই নতুন হয়ে ওঠার দিন। এই নতুন দিনে তাই মানুষের মিলনমেলায় চঞ্চল হয়ে ওঠে মন, সব ভেদাভেদের আবরণ ভেঙে, প্রাণের উষ্ণ পরশে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-নির্বিশেষে সবাই একাকার হয়ে যায়।
নবজন্ম, পুনরুজ্জীবনের ধারণা, পুরনো জীর্ণ এক অস্তিত্বকে বিদায় দিয়ে এ যেন এক নতুন সূর্যোদয়ে সতেজ সজীব নবীন জীবনের মধ্যে প্রবেশ করার আনন্দানুভূতি। ইংরেজ কবি টেনিসন বলেন— “রিং আউট দ্য ওল্ড, রিং ইন দ্য নিউ, রিং হ্যাপি বেলস, অ্যাক্রস দ্য স্নো। দ্য ইয়ার ইজ গোয়িং, লেট হিম গো, রিং আউট দ্য ফলস, রিং ইন দ্য টু।”
আবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে শুনি আরেক উদাত্ত আহ্বাণ— “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা। রসের আবেশ রাশি শুষ্ক করে দাও আসি, আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাখ মায়ার কুজ্ঝটিকাজাল যাক দূরে যাক।”
হয়তো তাই এপার ও ওপার বাংলায় প্রতিটি মানুষ প্রতি পয়লা বৈশাখের ভোরে অনুভব করে তাদের প্রাণের কবির এই চিরনতুন, চিরসবুজ পংক্তির সারমর্ম। তবে বাঙ্গালীর নববর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে জানতে হলে আমাদের চোখ রাখতে হবে দুই বাংলার সাহিত্যে।
বাংলাকাব্যের মধ্যযুগে নববর্ষ পালন সম্পর্কে বিশেষ কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মধ্যযুগের কাব্যে ঋতুর বর্ণনা আছে, বারমাসি বা বারমাস্যা আছে। ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় গ্রামীণ ব্যঞ্জনায় মলুয়ার বারমাসি পাওয়া যায়। আবার ‘চণ্ডীমঙ্গলে’ ‘কালকেতুর উপাখ্যানে’ আমরা পাই ‘ফুল্লরার বারমাস্যা’, যে বর্ণনায় বৈশাখকে নির্দয় গ্রীষ্মকাল হিসাবে প্রতিভাত করা হয়েছে , উল্লেখ আছে এ সময় মানুষের গায়ে অগ্নিপ্রবাহের মতো দহন হত সূর্যের প্রখর তাপে- প্রথম বৈশাখ মাসে/ নিত্য ভাঙ্গে ঝড়ে।। অনল সমান পোড়ে/ বৈশাখের খরা। তরুতল নাহি মোর/ করিতে পসরা।। পদ পোড়ে খরতর/ রবির কিরণ। শিরে দিতে নাহি আঁটে/ খুঞার বসন।। বৈশাখ হইলো আগো/ মোরে বড় বিষ। মাংস নাহি খায় সর্ব্ব/ লোক নিরামিষ।। এখানে উল্লেখ্য, ততদিনে কিন্তু বাংলা বছরের প্রথমে এসে গেছে বৈশাখ মাস।
মধ্যযুগের পর এবার আসা যাক পরবর্তী কালের সাহিত্যে। সিকান্দার আবু জাফর তাঁর ‘হালখাতা’ গল্পে লিখেছেন— ‘ছেলেবেলায় কিন্তু পয়লা বৈশাখের ওপরে আমার একটা বিশেষ মোহ ছিল। কারণটা বলি। স্কুল যেখানে বসতো, তার পাশেই ছিল বাজার। পয়লা বৈশাখে বাজারের দোকানে হতো ‘হালখাতা’। জিনিসটা বুঝতাম না। বুঝবার তেমন আগ্রহও ছিল না। তবে হালখাতা উপলক্ষে দোকানদাররা যে মিষ্টি খাওয়াত গ্রাহক-অনুগ্রাহকদের, সেটাই ছিল পয়লা বৈশাখ সম্বন্ধে আমাদের মোহ এবং হালখাতা সম্বন্ধে আমার জ্ঞানের শেষ সীমানা। হাড়কৃপণ সাধু ময়রা পর্যন্ত সেদিন দাম না নিয়ে দু-একটা কদমা অথবা দু-চারখানা গজা অম্লান বদনে খাইয়ে দিত। তখন এইটুকু সৌভাগ্যের জন্যেই পয়লা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা হয়নি।’
দীনেন্দ্রকুমার রায় ‘পল্লীচিত্র’ গ্রন্থে বৈশাখে গ্রামীণ মেলার যে আকর্ষণীয় বিবরণ দিয়েছেন সেই ছবি কালান্তরে আজও ম্লান হয়নি— ‘দোকান পশারীও কম আসে নাই…। দোকানদারেরা সারি সারি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অস্থায়ী চালা তুলিয়া তাহার মধ্যে দোকান খুলিয়া বসিয়াছে। …এক এক রকম জিনিসের দোকান এক এক দিকে। কোথাও কাপড়ের দোকান, কোথাও বাসনের, কোথাও নানাবিধ মনিহারি দ্রব্যের দোকান। এত রকম সুন্দর পিতল-কাঁসার বাসন আমদানি হইয়াছে যে, দেখিলে চক্ষু জুড়ায়। কৃষ্ণনগর হইতে মাটির পুতুলের দোকান আসিয়াছে; নানা রকম সুন্দর সুন্দর পুতুল…। জুতার দোকানে চাষীর ভয়ঙ্কর ভিড়। কাপড়ের দোকানে অনেক দেখিলাম। …লোহালক্কড় হইতে ক্যাচকেচের পাটী পর্যন্ত কত জিনিসের দোকান দেখিলাম…। মিষ্টান্নের দোকানও শতাধিক। …কুমারের দোকানে মাটির হাঁড়ি-কলসি পর্বতপ্রমাণ উচ্চ হইয়া উড়িয়াছে। কাঁঠাল বিক্রেতাগণ ছোট-বড় হাজার হাজার কাঁঠাল গরুর গাড়িতে পুরিয়া বিক্রয় করিতে আনিয়াছে…..।’
সত্যি, সেকালে চৈত্র- বৈশাখের এসব মেলা ছিল মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র। তবে আজও বাংলার গ্রামে বিভিন্ন ধর্মের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরের কলকোলাহলে মুখরিত হয় মেলাপ্রাঙ্গণ! কেউ আসে বিকিকিনির আশায় আবার কেউবা আসে বিনোদনের টানে। সেখানে থাকে আরও নানাবিধ আকর্ষণ -যাত্রা , সার্কাস, পুতুল নাচ। গাঁয়ের বধূর ঝোঁক থাকে আলতা-সিঁদুর-স্নো-পাউডার-জলেভাসা সাবান, ঘর-গেরস্থালির টুকিটাকি জিনিসের প্রতি। আর শিশু-কিশোরের মন পরে থাকে মূলত খেলনার দোকানে! চোখ খুঁজে বেড়ায় মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, টিনের জাহাজ, মুড়ি-মুড়কি, খই-বাতাসা, কদমা-গজা, জিলিপি-রসগোল্লা। মায়ের আঁচল ধরে বা বাবার হাত ধরে সবই তাদের কেনা চাই। আর চাই তাদের সুকুমার হৃদয়ের চিরকালের আনন্দের উৎস সেই ‘তালপাতার বাঁশি’— ‘সবার চেয়ে আনন্দময় ওই মেয়েটির হাসি, এক পয়সায় কিনেছে ও তালপাতার এক বাঁশি।’
জীবনের এই টুকরো আনন্দের মধ্যে ধরা পড়ে রূপ-বৈভবের চেতনামিশ্রিত নতুন অনুভবের উল্লাস। এ রূপ চিরন্তন, এ রূপ জন্ম দেয় এ বাংলার সংস্কৃতির, যা তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রতিবার বর্ষশেষে চৈত্র বিদায় নেয় আকাশে কালো পুঞ্জমেঘের জটাজাল বিস্তার করে। তবে সে মেঘে আকাশ আবৃত হলেও বৈশাখী ভোরে এক বুক আশার বর্ণচ্ছটায় রামধনু ওঠে মনের আকাশে।
উপসংহার
বৈশাখ তার রুদ্ররূপ নিয়ে আবির্ভূত হলেও তার ‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে’ এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন বিছিয়ে রাখে তার মায়াজাল, যা এদেশে-বিদেশে সমস্ত বাঙালীহৃদয় নববর্ষের পুণ্যলগ্নে এক নতুন প্রত্যাশায় সানন্দে গ্রহণ করে তাদের জীবনে।
আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পয়লা বৈশাখে হোমকীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়।
জমিদারি আমলে পয়লা বৈশাখের প্রধান আয়োজন ছিল খাজনা আদায় উপলক্ষে ‘রাজপুণ্যাহ’ ও ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’। জমিদারি প্রথা বিলোপের প্রায় সাথে সাথেই বিলুপ্ত হয়ে যায় ‘রাজপুণ্যাহ’। কালের অগ্রগতিতে পরবর্তীক্ষেত্রে ব্যবসা-বানিজ্য তথা লেনদেনেও আসে আমুল পরিবর্তন। ধীরে ধীরে জৌলুস হারায় ‘হালখাতা’ , আর এই প্রযুক্তির যুগে শুধু তার নামটি থেকে যায় উৎসবমেদুরতা নিয়ে।
ইদানীং নাগরিক জীবনে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে যে উচ্ছ্বাস, যে সাংস্কৃতিক চেতনা, তার প্রাণপুরুষ কিন্তু আমাদের সবার রবি কবি, আট থেকে আশি, আপামর বাঙ্গালীর মনের মানুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই সর্বপ্রথম শান্তিনিকেতনে ঋতু উৎসবের আয়োজন করেন। আর বর্ষ বরণের উৎসবের জন্য রচনা করেন বহু কালজয়ী সঙ্গীত ও কাব্যগুচ্ছ।
আজও আসমুদ্র হিমাচলের বাঙ্গালীমননে নববর্ষ বললেই ভেসে ওঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ ধ্বনি। সেই ‘মধুর গম্ভীর ধ্বনি প্রভাত অম্বরে দিকে দিকান্তরে ভুবনমন্দিরে শান্তিসঙ্গীত’ হয়ে বেজে ওঠে। লন্ডন হোক বা নিউ ইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়া হোক বা সুইডেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম হোক বা কলকাতা-বীরভূম,নতুন বছরের আবাহনে সব বাঙ্গালীর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় সেই এক সুর। বিশ্বায়নের আলোয় আলোকিত হয়ে, নিজ দেশে বা পরবাসে, হিন্দু বা মুসলিম সব বাঙালীই এই বর্ষ শুরুর পুণ্যলগ্নে একাকার হয়ে যায় তাদের প্রভাত ফেরি ও ভোরের আজানে। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিতে বা মসজিদের নামাজে উৎসবমুখর বাঙ্গালী হৃদয় মিলিত কণ্ঠে প্রার্থনা করে – ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো, তাপস নিঃশ্বাসবায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ তবে এতো আনন্দের মধ্যে কোথায় যেন একটু তাল কেটে যায় যখন বাঙালির এই আনন্দোৎসব দুই বাংলার কাছে আসে দুটি ভিন্ন দিনে। এপার বাংলায় অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে বাঙ্গালীরা বর্ষবরণ করে সাধারণত ১৫ই এপ্রিল (কখনো ১৪ই এপ্রিল) । অন্যদিকে ওপার বাংলায় অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ পালিত হয়।
বঙ্গভঙ্গেও ভগ্ন না হওয়া বাঙ্গালী হৃদয়ে তাই প্রশ্ন জাগে একই বৃন্তে দুটি কুসুম ফুটিয়ে তোলা এই দুই বাংলায় একই দিনে বর্ষবরণ করতে অসুবিধা কোথায়?
যে বাংলাভাষা ও বাঙ্গালী ঐতিহ্যকে নিয়ে আমরা এতো গর্ব করি, এভাবে সমগ্র বিশ্বের কাছে সেই ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সম্প্রদায়কে অযথা কিছু প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন করা কি সত্যিই যুক্তিযুক্ত? দুই বাংলার বিশিষ্টজনেরা বসে কি বের করে আনতে পারেন না এর এক সহজ এবং সর্বজনগ্রাহ্য সমাধানসুত্র?
একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা দিবসে যেমন সীমারেখার কাঁটাতারের বাধা পেরিয়ে মিলে মিশে একই সুত্রে গ্রথিত হয় ইছামতীর দুটি পারের দুই বাংলার শত-কোটি প্রাণ, বাঙ্গালীর প্রানের মানুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ২৫শে বৈশাখে যেমন একাকার হয়ে যায় কবি স্মৃতি বিজড়িত জোড়াসাঁকো–শিলাইদহ-শান্তিনিকেতন, গঙ্গা-পদ্মার কুল ছাপিয়ে যেমন ভেসে আসে –
“হে নুতন দেখা দিক আর-বার, জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।”
তেমনি, ঠিক তেমনিভাবে আগামী দিনে দুই বাংলার মানুষ যেন তাদের উদ্বাস্তু সমস্যা, উগ্রপন্থী মনোভাব, পদ্মা-ভাগীরথী তথা তিস্তা-তোর্সার জলবণ্টনের বিবাদ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হারজিত নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ বিদ্রূপ, নিজ সংস্কার থেকে বেরিয়ে সাম্প্রতিক ভাইরাল হওয়া নাগীননৃত্যে কুরুচির প্রকাশ এবং ব্যক্ত ও অব্যক্ত সকলপ্রকার বৈষম্য ভুলে এই বর্ষবরণের দিনে দেশ কালের গণ্ডী পেরিয়ে একই সাথে গলা মিলিয়ে একই দিনে উদ্দিপিত হতে পারে চির নুতনের জয়গানে, মিলিত ভাবে সারা পৃথিবীর বুকে তুলে ধরতে পারে মানবতার তথা সৌভ্রাত্বিত্বের বিজয় পতাকা।
প্রশ্ন জাগতে পারে, এক দিনে নববর্ষ উদযাপন করলেই কি ঐক্যবদ্ধ হবে এই দুই বাংলার মানুষ? কিন্তু কে বলতে পারে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এইভাবেই মিলিত হবে দেশভাগে বিভক্ত দুই পাঞ্জাব, অথবা মানুষের হিংসা ও পেশীশক্তির প্রতিভূ দুই কাশ্মীর! দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এতো হিংসা, এতো প্রাণনাশ, এতো রক্তক্ষরণ হয়তো অচিরেই বন্ধ হবে। আর যদি সত্যিই এই অসম্ভব সম্ভব হয়, তৃতীয় বিশ্বের এহেন একতায় নিশ্চিতভাবে ক্রমশ অনুপ্রাণিত হবে সারা বিশ্ব।
শান্তির পতাকা উড়বে সারা পৃথিবী জুড়ে। থাকবেনা প্রতিপত্তিশালী দেশের দুর্বলের প্রতি আস্ফালন, পুনরাবৃত্তি ঘটবে না কোনও হিরোশিমা নাগাসাকির! একমাত্র ভৌগোলিক অবস্থান ছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে থাকবে না কোনও পারস্পরিক দূরত্ব, তাদের মনের মানচিত্রে থাকবে না কোনও লক্ষ্মণ রেখা, জেগে উঠবে মনুষ্যত্ব। কবিগুরুর ভাষায় মিলিত কণ্ঠে আমরা সেদিন পরস্পরকে বলতে পারব – “ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি, প্রেম ভরিয়া লহ শূন্য জীবনে।” সেই ‘অরুণপ্রাতে’ জীবনের প্রতিটি দিনই হয়ে উঠবে অর্থবহ, সার্থক হবে এই দুর্লভ মানবজন্ম। জগতের সেই আনন্দযজ্ঞে তবেই তো আসবে নতুন দিন, প্রতিদিন ঘটবে নতুন সূর্যোদয়, পূর্ণতা পাবে নববর্ষ, আনন্দধারা বহিবে ভুবনে।
তথ্যসূত্র :
১. সঞ্চয়িতা,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ ২. গীতবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, ১৩৭৫ বঙ্গাব্দ ৩. নজরুল গীতিকা, নজরুল ইসলাম, ১৯৩০ ৪. বেদাঙ্গ- ইন দ্য ইলাস্ট্রেটেড এন্সাইক্লোপিডিয়া, জেমস লচফিল্ড, ২০০২, ৫. হালখাতা, সিকান্দার আবু জাফর, ১৯৭৫ ৬. রচনা সমগ্র, দীনেন্দ্রকুমার রায়, ১৯৪৩ ৭. বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয়, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৯৮ ৮. শারদীয়া সংখ্যা এক্ষণ, সুখময় মুখোপাধ্যায়, ১৪০০ বঙ্গাব্দ ৯. চন্ডীমঙ্গলকাব্য, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ১৮২৩ ১০. বাংলাদেশের উৎসব নববর্ষ: সম্পাদনা মোবারক হোসেন, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০৮ ১১. আ হিস্ট্রি অফ দ্য নিউ ইয়ার, ব্রুনার, ইনফোপ্লিজ.কম, ২০১৪ ১২. দ্য ক্যালেন্ডার অফ দ্য রোমান রিপাবলিক, মাইকেল, প্রিন্সটন, ১৯৬৭ ১৩. সূর্যসিদ্ধান্ত- অ্যা টেক্সট বুক অফ হিন্দু অ্যাস্ট্রোনমি, বারগেস- গাঙ্গুলি- সেনগুপ্ত, ১৯৮৯ ১৪. পূর্ববঙ্গ গীতিকা, দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত, ১৯২৩ ১৫. স্টাডিস ইন দ্য ব্রাহ্মনাস, এ সি ব্যানার্জী, ১৯৬৩ ১৬. দ্য আরগুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ানঃ রাইটিংস অন ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কালচার অ্যান্ড আইডেনটিটি, অমর্ত্য সেন, ২০০৫ ১৭. দ্য সেক্রেড বুক্স অফ হিন্দুস, ভলিউম ১৭- দ্য মৎস্যপুরাণ, শ্রীশচন্দ্র বসু, ১৯১৬
Dr. Dipa Mitra
Associate Professor & Former Head, M.Phil & Ph.D Program Indian Institute of Social Welfare & Business Management KOLKATA
RELATED BLOGS
Chapter Two: What Kashmir Wants the World to.
In the aftermath of the Baisaran Valley tragedy, Kashmir did not succumb to despair—it rose from its anguish, showing.
- April 30, 2025
- By dmitra
A Handbook Of Retail Management: Principles & Practices
Retailing is the final step of an economic activity and the essence of retailing comprises of selling goods and.
- January 25, 2025
- By Dr.